শব্দে বোনা এক উন্মাদ জীবন: কবি সানজিদা বিনা

Dailyreporttm_20251219_145926_0000

ছবি: কিবি সানজিদা বিনা

কেউ তাকে বলে 'শব্দশ্রমিক', কেউ বলে 'স্বপ্নচারিনী', আবার কেউ কেউ আড়ালে তাকে ডাকে 'পাগল লেখিকা'। কিন্তু সানজিদা বিনার কাছে এসব বিশেষণের কোনো মানে নেই। তার কাছে জীবন মানে এক সাদা খাতা, আর তার রক্তে মেশানো নেশা হলো সেই খাতায় কলমের আঁচড়ে প্রাণদান করা।

সানজিদা বিনার জন্ম এক মেঘলা দুপুরে। লোকে বলে, তার জন্মের সময় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল, যেন প্রকৃতি তাকে বরণ করে নিতে চেয়েছিল এক বিষণ্ণ সুরের আবহে। ছোটবেলা থেকেই সানজিদা অন্য দশটা বাচ্চার মতো ছিল না। পুতুল খেলার বয়সে সে বাগানের ঝরা পাতা কুড়িয়ে তাতে আঙুল দিয়ে অদৃশ্য সব গল্প লিখত। সেই যে শুরু, তারপর থেকে শব্দই হয়ে উঠল তার পরম আত্মীয়। 

সানজিদা বিনাকে 'পাগল লেখিকা' বলার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তিনি যখন কোনো উপন্যাস লিখতে বসেন, তখন এই বাস্তব জগত থেকে তিনি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। কখনো মাঝরাতে মোমবাতির আলোয় তাকে দেখা যায় বিড়বিড় করে নিজের সৃষ্ট চরিত্রের সাথে কথা বলছেন। কখনো আবার কোনো কবিতার চরণের জন্য টানা তিনদিন অভুক্ত অবস্থায় জানালার ধারে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

তার এই নেশা সাধারণ মানুষের চোখে পাগলামি মনে হতে পারে, কিন্তু সানজিদা জানেন—সৃজনশীলতা এক ধরনের দহন। এই আগুনে না পুড়লে শব্দগুলো কখনো জীবন্ত হয়ে ওঠে না। তার কাছে গল্প লেখা মানে কেবল অক্ষর সাজানো নয়, বরং নিজের হৃদয়ের স্পন্দনকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে দেওয়া।

সানজিদা বিনার লেখনীর পরিধি বিশাল। তার কবিতায় পাওয়া যায় এক অদ্ভুত হাহাকার আর প্রেমের সুক্ষ্ম কারুকাজ। তার একেকটি কবিতা যেন এক ফোঁটা নীল বিষ, যা পাঠকের হৃদয়ে প্রবেশ করে এক মধুর যন্ত্রণা দেয়।

আবার যখন তিনি ছোটগল্প লেখেন, তখন সমাজের অবহেলিত মানুষের মুখগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। তার গল্পে রাজপুত্র বা রাজকন্যা থাকে না, থাকে ফুটপাতে পড়ে থাকা কোনো শিশুর হাসি কিংবা একলা বৃদ্ধার দীর্ঘশ্বাস। আর তার উপন্যাসের কথা তো বলাই বাহুল্য। সানজিদার উপন্যাস মানেই এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ভ্রমণ। মানুষের মনের অন্ধকার অলিগলি তিনি যেভাবে কলমের ডগায় তুলে আনেন, তা দেখে বোদ্ধা পাঠকরাও চমকে যান।

সানজিদা বিনার ঘরটি এক আশ্চর্য জাদুঘর। চারদিকে বইয়ের স্তূপ, কাগজ আর কালির ছড়াছড়ি। জানালার পাশে একটা পুরনো টেবিল, যেটার ওপর বসে তিনি রাতকে দিন করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, লেখককে হতে হয় একা। ভিড়ের মাঝে থেকে কখনো কালজয়ী সৃষ্টি সম্ভব নয়। তাই তো উৎসবের আমেজে যখন সবাই মেতে ওঠে, সানজিদা তখন তার কাল্পনিক চরিত্রদের সাথে নিয়ে কোনো এক উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্স তৈরি করতে ব্যস্ত থাকেন।

সানজিদা বিনা কখনো যশের পেছনে ছোটেননি। অনেক বড় বড় প্রকাশনী তার পাণ্ডুলিপি নেওয়ার জন্য লাইন ধরে, কিন্তু তিনি নিজের মনের সায় না পাওয়া পর্যন্ত কোনো লেখা কাউকে দেন না। তার কাছে লেখালেখি কোনো পেশা নয়, বরং এটা তার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। তিনি প্রায়ই বলেন— "যেদিন আমার কলম থেমে যাবে, সেদিন বুঝতে হবে সানজিদা বিনার নিঃশ্বাসও থেমে গেছে।"

সানজিদা বিনা আজও লিখে চলেছেন। তার পাগলামি কমেনি, বরং বেড়েছে। সময়ের সাথে সাথে তার শব্দের ধার বেড়েছে, গল্পের গভীরতা বেড়েছে। তিনি এমন একজন লেখিকা, যিনি মানুষের হৃদয়ের না বলা কথাগুলো কাগজের বুকে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। 

তার জীবনী কোনো সাধারণ মানুষের গল্প নয়; এটি একটি সংগ্রামের গল্প, একটি নেশার গল্প এবং সর্বোপরি শব্দের প্রতি এক অবিরাম প্রেমের গল্প। সানজিদা বিনা আজীবন ওই 'পাগল লেখিকা' হয়েই থাকতে চান, কারণ এই পাগলামির মাঝেই লুকিয়ে আছে তার আসল সার্থকতা। তিনি জানেন, শরীর মরে গেলেও তার কবিতা আর গল্পগুলো পাঠকদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।

কবি সানজিদা বিনা—যিনি কলম দিয়ে স্বপ্ন বোনেন আর শব্দ দিয়ে গড়েন এক নতুন পৃথিবী।


Comment As:

Comment (0)


Your application license has expired!
Contact bdtask.com