৩ জেলার সীমানায় মাদকের স্বর্গরাজ্য অষ্টধার: ভৌগোলিক ফাঁদে অসহায় পুলিশ

Dailyreporttm_20260715_233706_0000

মোঃ ফরহাদ আলী (মায়া), ময়মনসিংহ:

মাদকের ভয়াল থাবায় ধুঁকছে ময়মনসিংহের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো। হাত বাড়ালেই মিলছে মরণনেশা ইয়াবা, গাঁজাসহ নানা মাদকদ্রব্য। এই বিষাক্ত ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না স্কুলপড়ুয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোররাও। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার প্রান্তীয় ইউনিয়ন বিদ্যাগঞ্জ এবং তিন জেলা ও চার উপজেলার সীমান্তবর্তী অষ্টধার ইউনিয়ন। ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশার সুযোগ নিয়ে এই এলাকাটি এখন রীতিমতো মাদকের বিশাল বাজারে পরিণত হয়ছে। 

অষ্টধার ইউনিয়নের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক কারবারিদের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা। ইউনিয়নটি ময়মনসিংহ সদর ও পার্শ্ববর্তী শেরপুর ও জামালপুর জেলার বর্ডার হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে প্রতিনিয়তই চোর-পুলিশ খেলছে মাদক ব্যবসায়ীরা। তাদের নেটওয়ার্ক এতটাই সুসংগঠিত যে, এক উপজেলার প্রশাসন ধাওয়া করলে মুহূর্তেই সীমানা পার হয়ে অন্য উপজেলায় আশ্রয় নেয় তারা। প্রশাসনিক সীমানার এই জটিলতার কারণে প্রতিবারই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় মূল সিন্ডিকেটগুলো।

ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানা থেকে অষ্টধার ইউনিয়নের দূরত্ব প্রায় ২৭ কিলোমিটার। কিন্তু রাস্তাঘাটের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, বাধ্য হয়ে মুক্তাগাছা উপজেলা ঘুরে প্রায় ৩২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পুলিশকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয়। এতে সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক সোর্স জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের সুনির্দিষ্ট তথ্য পুলিশকে জানানো হলেও কোনো লাভ হয় না। কারণ, একজন মাদক কারবারি তার স্পটে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ মিনিট অবস্থান করে। অন্যদিকে, ভাঙাচোরা রাস্তা পার হয়ে পুলিশের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। পুলিশ পৌঁছানোর আগেই তারা মাল বিক্রি করে নিরাপদে সরে পড়ে।

দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তাও এই অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করে বলেন, অনেক সময় আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্য পাই, কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থার চরম অবনতি এবং থানা থেকে অতিরিক্ত দূরত্বের কারণে সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এছাড়া ইউনিয়নের একটি বড় অংশ ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে চরাঞ্চলে হওয়ায় সেখানে অভিযান চালানো আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।

মাদকের এই সহজলভ্যতার কারণে এলাকায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই ও পারিবারিক সহিংসতার মতো ভয়ংকর অপরাধ। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কিশোর ও যুবকরা জড়াচ্ছে নানা অপকর্মে। প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হচ্ছে অসংখ্য পরিবার, চোখের জল ফেলছেন অসহায় বাবা-মায়েরা।

দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় এখন নিজেরাই প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তারা বিভিন্ন মিটিং ও সালিশের মাধ্যমে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলছেন।

অষ্টধার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এমদাদুল হক আরমান বলেন, আমাদের ইউনিয়নটি শহর থেকে অনেক দূরে এবং রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই নাজুক। সঠিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছাতে না পারার সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে মাদক কারবারিরা। তবে আমরা বসে নেই। ইতিমধ্যে ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে ইউপি সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সচেতন মহলকে নিয়ে কমিটি গঠন করে এই মাদক সিন্ডিকেটগুলোকে সামাজিকভাবে প্রতিহত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, শুধু সামাজিক প্রতিরোধ দিয়ে এই বিশাল নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব নয়। অষ্টধার বা এর আশপাশে একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বা তদন্ত কেন্দ্র স্থাপন করা না হলে এই জনপদকে মাদকের ছোবল থেকে বাঁচানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।


Comment As:

Comment (0)


Your application license has expired!
Contact bdtask.com