Dailyreport Live
Dailyreport Live
Friday, 17 Apr 2026 18:00 pm
Dailyreport Live

Dailyreport Live

আমার জীবনের গল্পটা আর দশটা সাধারণ মানুষের মতোই। কোনো ট্র্যাজেডি নেই, শুনে কেউ হয়তো কাঁদবে না; বরং গল্পটা শুনে অনেকের ঠোঁটে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠতে পারে। আমি আফসানা মিমি, বয়স ২১। আমার বেড়ে ওঠা গ্রামের এক স্নিগ্ধ পরিবেশে। ছোটবেলা থেকেই আমি ছিলাম ভীষণ চঞ্চল, ঠিক যেমনটা গ্রামের মেয়েরা হয়।

১৯ নং শশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আমার পড়ালেখার শুরু। তখন আমি ক্লাস টু-তে পড়ি। এত কিছু বুঝতাম না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা জেদ কাজ করত—সবার মতো আমার হাতেও একটা পুরস্কার থাকুক। সেই জেদ থেকেই স্কুলের এক প্রতিযোগিতায় গান গাইতে নামলাম। ম্যাডাম শিখিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু গাইতে গিয়ে নার্ভাস হয়ে একটু ভুল করে ফেললাম। ব্যস, পুরস্কার জুটল না কপালে! মন খারাপ করে ভাবলাম, আর কখনো এসব প্রতিযোগিতায় নামব না।

কিন্তু আমার ভেতরের সুপ্ত জেদটা মানল না। ক্লাস ফোরে উঠে আবার নাম দিলাম দৌড় প্রতিযোগিতায়। কিন্তু ভাগ্য যেন আমার সাথেই দৌড়াচ্ছিল, এবারও হলাম চতুর্থ! পুরস্কার এবারও হাতছাড়া। ভাবলাম, গান বা দৌড় আমার জন্য নয়, বরং বক্তৃতা দিই। বড়দের সাহায্য নিয়ে একটা স্ক্রিপ্ট লিখে ম্যাডামকে শোনাতে গেলাম। কিন্তু ম্যাডাম ধমক দিয়ে বললেন, "এসব হবে না, ভালো হয়নি।" সেবারও হতাশ হলাম। অন্য ছাত্রছাত্রীদের পুরস্কার পেতে দেখে আমার ছোট্ট বুকে একটা হাহাকার জাগত—ইশ, আমারও যদি এমন একটা পুরস্কার থাকত!

এরপর একদিন মাদ্রাসার এক অনুষ্ঠানে গজল গাইলাম। হুজুর খুশি হয়ে আমাকে একটা কলম উপহার দিলেন। সেই ছোট্ট কলমটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম স্বীকৃতি! এরপর থেকে এলাকায় কোনো মাহফিল হলেই সবাই খুঁজত, "আফসানা মিমি কোথায়?" তখন থেকে মনের ভেতর একটা অদ্ভুত আনন্দ আর আত্মবিশ্বাস জন্ম নিতে শুরু করল।

ছোটবেলার মেলায় অন্য বাচ্চারা যেখানে খেলনা বা খাবার কিনত, আমার চোখ আটকে থাকত ছোট প্লাস্টিকের গিটার বা ঢোল-তবলার দিকে। একবার দাদার সাথে মেলায় গেলাম। দাদার কাছে ছিল ৫০ টাকা, আর গিটারের দাম ১০০ টাকা। গিটার আর কেনা হলো না, মন খারাপ করে একটা ছোট ঢোল কিনে বাড়ি ফিরলাম। এরপর যতবার মেলায় গেছি, গিটার কেনার স্বপ্নটা অপূর্ণই থেকে গেছে, ফিরেছি ওই ঢোল-তবলা নিয়েই।

কাউনিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে যখন মাধ্যমিকে পড়ি, তখন থেকেই আমার আসল জয়যাত্রা শুরু। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংক দৌড়ে প্রথম স্থান অধিকার করলাম! সেই থেকে স্কুলে কোনো প্রতিযোগিতা হলে আমি থাকবই, আর তিনটি খেলায় নাম দিলে অন্তত দুটিতে পুরস্কার নিয়ে ফিরবই। চিত্রাঙ্কন, গান, কবিতা আবৃত্তি, এমনকি ‘বিজয় ফুল’ তৈরি—সবকিছুতেই আমি ছিলাম প্রথম সারিতে। ক্লাস সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত আমি প্রায় ২৭টি পুরস্কার জিতেছি। আমার ডায়েরির পাতায় পাতায় এখনো লেখা আছে সেইসব অমূল্য অর্জনের কথা। আমি প্রচুর গান লিখতাম, সেই ডায়েরিগুলো আজও আমি পরম যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছি। আমার গানের প্রতি এই পাগলামি দেখে গ্রামের মানুষও বুঝে গিয়েছিল—মেয়েটার ভেতরে সুরের একটা আলাদা জগৎ আছে।

এসএসসির পর যখন পিয়ারপুর মহারাজা শশীকান্ত উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ভর্তি হলাম, তখন থেকে নতুন এক জীবনের সূচনা। কলেজে ২০০-৩০০ মানুষের মধ্যে রচনা প্রতিযোগিতায় আমি প্রথম হলাম।

স্কুলে পড়ার সময় আমার খুব শখ ছিল সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়ার। আব্বাকে বললাম, "আমাকে একটা সাইকেল কিনে দাও।" আব্বা হেসে বললেন, "প্রাইভেট কার কিনে দেবো!" কিন্তু গ্রামের মানুষ তো, তারা ভাবল মেয়ে মানুষ সাইকেল চালাবে, লোকে কী বলবে! তখন আমি শর্ত দিলাম, "ঠিক আছে, সাইকেল লাগবে না, কিন্তু এসএসসি পাশ করার পর আমাকে গানের স্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে।" আমার পল্লি বিদ্যুতে কর্মরত বাবা আর আমার সবচেয়ে বড় সাপোর্ট সিস্টেম—আমার বড় বোন, দুজনেই রাজি হলেন।

এসএসসি পাশ করার পর বড় আপুকে বললাম, "আমাকে একটা গিটার কিনে দাও।" আপু কোনো প্রশ্ন ছাড়াই আমাকে একটা গিটার কিনে দিল। কিন্তু গ্রামে থাকি, গানের স্কুল পাব কোথায়? ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে উঠে হাতে মোবাইল পাওয়ার পর শুরু হলো আমার খোঁজ। দুই বছর কেটে গেল, কিন্তু মনের মতো কিছু পেলাম না। অবশেষে ২০২৪ সালে মুক্তাগাছা হেল্পলাইনে একটা পোস্ট দিলাম। সেখান থেকেই সন্ধান পেলাম 'মুমু শিল্পাঙ্গন'-এর।

পরিচালক ইকবাল আঙ্কেলের সাথে কথা বললাম। বয়স বেশি ভেবে একটু দ্বিধায় ছিলাম, কিন্তু আঙ্কেল সাহস দিলেন। ২০২৪ সালের ১১ জুলাই আমি মুমু শিল্পাঙ্গনে ভর্তি হলাম। প্রথম গানের টিচার অনিন্দিতা চক্রবর্তী ম্যাডাম এবং পরে লেলিন স্যারের কাছে আমার গানের হাতেখড়ি। আট মাস পেরোনোর পর বুঝলাম, শুধু গিটার নয়, হারমোনিয়াম ছাড়াও গান শেখা অসম্পূর্ণ। আবারও আমার ত্রাতা হয়ে এলেন বড় আপু। তার টাকায় হারমোনিয়াম কিনলাম।

আমি সত্যিই ভাগ্যবতী যে, আমি এমন একটা পরিবার পেয়েছি, যারা আমার প্রতিটি পদক্ষেপে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, আমি চাইলে তারা আমাকে সবকিছুই দেয়।

বর্তমানে আমি ময়মনসিংহে আলমগীর মনসুর মিন্টু মেমোরিয়াল কলেজে প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি। পড়াশোনায় হয়তো আমি খুব আহামরি কেউ নই, কিন্তু স্কুল-কলেজ বা ভার্সিটি—সবখানেই স্যার-ম্যাডামদের কাছে আমি পরিচিত আমার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য।

এখন আমি ফেসবুকে প্রফেশনাল আইডি খুলে গান আর কনটেন্ট বানাই। গ্রামের মানুষ, ছোট থেকে বড়—অনেকেই টিটকারি করে, অনেক কটু কথা কানে আসে। কিন্তু আমি হাসি মুখে সব এড়িয়ে যাই। আমার ১৯ হাজার ফলোয়ার্সের ভালোবাসা আর পরিবারের সাপোর্ট আমাকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়। আগে হয়তো পরিবার একটু ভাবত লোকে কী বলবে, কিন্তু এখন তারা এসবের তোয়াক্কা করে না।

এই হলো আমার ছোট্ট জীবনের গল্প। ব্যর্থতা থেকে শুরু করে একটু একটু করে নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। আমি আফসানা মিমি, যার স্বপ্নগুলো একসময় প্লাস্টিকের গিটারে আটকে ছিল, সে আজ সত্যি সত্যিই সুরের আকাশে ডানা মেলতে শুরু করেছে। আলহামদুলিল্লাহ, সব মিলিয়ে আমি খুব ভালো আছি।

Your application license has expired!
Contact bdtask.com